প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস


SHKSC-01সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজ ঢাকা শহর সংলগ্ন ডেমরার একটি শিক্ষাঙ্গন। বাংলাদেশের মানচিত্রে এই প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান হয়তো একটি বিন্দুর মত। হোক বিন্দু, বিন্দুও সিন্ধু হয় যদি তার থাকে গতি। একটি মহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি শিক্ষণীয়  ইতিহাস, তা প্রভাবিত করে প্রতিবেশ, সমাজ, স্বদেশ, নির্মান করে সুস্থ, শৃঙ্খল সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে কোন বিশেষ স্থানের   পরিবেশ। তার সদম্ভ পথচলা অনুপ্রাণিত করে সে অঞ্চলের সচেতন শ্রেণিকে হীরকোজ্জ্বল স্বপ্ন দেখতে। তাই কোন বড় মাপের বিদ্যাঙ্গনের ভৌগোলিক মূল্য নয়, গ্রাহ্য তার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য। কোন বিশেষ প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস মানে কোন সমাজের হয়ে ওঠার ইতিহাস, তারুণ্য ও বুদ্ধি প্রকৌশল সৃষ্টির ইতিহাস।

দুইযুগ পেরোনো সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজ সৃষ্টি,প্রজ্ঞায় বেশ প্রাগসর । ডেমরা অঞ্চল দীর্ঘকাল  ভাগ্যবিড়ম্বিত ছিল। তবে অর্থ প্রাচুর্যে আজ সে সোনায় সোহাগা হয়েছে এমনও নয়। কিন্ত শিক্ষা সংস্কৃতির পরিবর্তন  যে এসেছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। স্বাধীনতাউত্তরকালে ডেমরার এটাই সবেচেয় বড় প্রাপ্তি। শিক্ষাগত পরিবর্তনের মূল ধারায় বর্তমান প্রতিষ্ঠানেও সক্রিয় অবস্থান ছিলো। ডেমরা সম্পর্কে জনশ্রুতি - ডেমরা অখ্যাত, অনুন্নত। কল কারখানার শ্রমিকদের বসবাস এখানে।প্রত্যাশা ও প্রচেষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষার অভাব দূর করার জন্য গুচ্ছখানেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও ডেমরাবাসী হতাশামুক্ত হয়নি। তারই ফলশ্রুতিতে সামসুল হক খান জুনিয়র হাই স্কুলের গোড়াপত্তন হয়। মাতুয়াইলের বিশিষ্ট বিদ্যোৎসাহী ও জনহিতৈষী ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব সামসুল হক খান এই অক্ষয় অবদান রাখেন। সমাজকে বদলে দেবার বাসনা যার তীব্র এমন অবদান তার পক্ষেই রাখা সম্ভব। কাদা পানির ধান খেতে ১৯৮৯ সালে ছোট একটি টিনশেডের ঘরে ডজন খানেক শিক্ষক হাতে নিয়ে সামসুল হক খান জুনিয়র হাই স্কুল বিদ্যাশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করে। এই স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিলো অনধিক একশত। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে বাইশ বছর মানে দুইযুগ আগের এই এলাকার জনজীবনের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা। অর্থাৎ একটি অসচ্ছল লোকালয়ে এই স্কুলটি আত্ম প্রকাশ কের। আঁতুড় ঘরেই যার জীবনাবসানের সম্ভাবনা ছিলো নিরানব্বই ভাগ। কিন্ত সে মরেনি।

সে বেঁচে আছে, তরুণ তাগড়া জোয়ান হয়ে উঠেছে। যাই হোক, প্রায় অবৈতনিক একটি বিদ্যালয় শিক্ষক বৃন্দ ও পৃষ্ঠপোষকদের হাত ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ার দিকে। কী করে হল সেটাই কথা। আমাদের দেশে যে কোন নতুন প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অভিভাবকরা নতুন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খুবই হতাশা বোধ করে এবং এক ধরনের অনিশ্চয়তা বোধে তাড়িত হয়ে ছেলে মেয়েদেরেক নতুন প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে চান না। এ কথাও সত্য যে নতুন প্রতিষ্ঠানের হাজারো সীমাবদ্ধতা থাকে। অনেক শর্ত সাপেক্ষে, অনেক মুচলেকা দিয়ে নতুন শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানে আনতে হয়। আর তখন সব দায় দায়িত্ব বর্তায় শিক্ষকবৃন্দ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের উপর। উল্লেখিত সবগুলো সমস্যা সুচনালগ্নে সামসুল হক খান জুনিয়র হাই স্কুলকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। তখন না ছিলো পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না ছিলো বেতন। এমন দুর্দিনে প্রতিষ্ঠানের হাল শক্তভাবে ধরে রেখেছেন শিক্ষকবৃন্দ। আশা একটিই একদিন এ প্রতিষ্ঠানের সুদিন আসবেই। এভাবেই পার হয় ১৯৮৯ - ১৯৯৩ পর্যন্ত পাঁচ বছর। এতদিন এটি মৌখিক ভাবে জুনিয়র হাইস্কুল ছিলো। ১৯৯৩ সালে সরকারি স্বীকৃতির মাধ্যমে কার্যত জুনিয়র হাই স্কুলে রূপ লাভ করে। সেই সাথে নিরাশার মেঘও অনেকটা কেটে যায়। ১৯৯৩ সাল থেকেই নবম শ্রেণিতে ভর্তি আরম্ভ হয়। স্কুলের গতিবিধি, শিক্ষকদের দৃঢ়তা ও একনিষ্ঠতা দেখে কিছু ছাত্রছাত্রী বাইরে থেকে এসেও এখানে ভর্তি হয়। জুনিয়র হাই স্কুল পূর্ণোদ্যমে পূর্ণাঙ্গ হাইস্কুল হয়ে ওঠে।

ডেমরার অভিভাবকেরা এবার সামসুল হক খান উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দিকে ফিরে তাকাতে শুরু করেন। ১৯৯৫ সালে এই স্কুল প্রথমবারের মত এসএসসি পরীক্ষায় অবতীর্ন হয়। একই বছর এমপিওভুক্ত হয় সামসুল হক খান উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এমপিও প্রাপ্তির পর সামসুল হক খান উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে আর হতাশায় নিমজ্জিত হতে হয়নি। এরপর থেকে পরিকল্পনা ও পরিমার্জনার অধ্যায় সূচিত হয় এখানে। একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান রূপায়নে ব্রতী হয়ে পড়ে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ ও পৃষ্ঠপোষকেরা।

১৯৯৫ পরবর্তী সময় থেকে সামসুল হক খান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন শুরু হয়। প্রাথমিক, জুনিয়র, এসএসসি পর্যায়ে পঠন পাঠনে নানা কারুকাজ প্রবর্তিত হতে থাকে। নান রকম শৃঙ্খলা বিধানও করা হয়। প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পুনর্বিন্যাস হয়। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে ক্লাশের সময়কে প্রভাতী ও দিবা দুটি অংশে বিভক্ত করা হয়। বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং প্রশাসনিক সুবিধার জন্য শিফট প্রচলিত হয়। শিক্ষকবৃন্দের দায়িত্বেবাধ, একনিষ্ঠতা, শিক্ষার্থীর পাঠগ্রহণ সুনিশ্চিত ও সফল করার লক্ষ্যে ইনচার্জ শ্রেণিশিক্ষক, বিষয় ও বিভাগীয় দায়িত্বের ভিন্ন ভিন্ন দপ্তর তৈরি করা হয়। করা হয় শ্রেণিতে শ্রেণিতে মেধানুসারে সেকশন বিভাগ। কুইজ, মডেল টেস্টসহ রকমারি পরীক্ষা প্রবর্তিত হয় যেগুলো সেমিষ্টার ও প্রমোশন টেস্ট এর অতিরিক্ত। এই পদক্ষেপগুলো ছিলো যথেষ্ট পরিকল্পিত।

পরিকল্পনা ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠান সফলতার মুখ দেখেনা। এমপিও ভুক্তির পর থেকে এই প্রতিষ্ঠান সতর্কতা ও আন্তরিকতার সাথে অগ্রসর হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে সামসুল হক খান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভিন্নতা এখানে যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষ পরোক্ষ সকল অংশের সহযোগিতা প্রয়েোজনানুসারে কাজে লাগিয়েছে। অধ্যয়ন একটি শিল্প, সুকুমার মনোবৃত্তির সাথে এর সম্পর্ক। তবে এটি একক শিল্প নয়, যৌথ শিল্প। পাঠ গ্রহণকে সুদৃঢ়, সফল করতে কেবল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকই যথেষ্ট নয়, প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, পরিচালনা পর্ষদের দৃষ্টিভঙ্গি, অভিভাবকের সচেতনতা, শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিবেশ  এ সবেরও ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিষ্ঠান এ কথা বুঝেছে এবং তা কাজে লাগাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। পাঁচ সাত বছেরর অধিক সময় লেগেছে এই প্রতিষ্ঠানকে একটি সুদৃঢ় স্থানে নিয়ে আসতে। এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিখুঁত চিন্তার ফল। একে গবেষণা বললে অত্যুক্তি করা হবে না। এই দীর্ঘ কার্যক্রম অটুটভাবে অব্যাহত রাখা কতখানি সময়, শ্রম, ধৈর্য ও অভিজ্ঞতা নির্ভর তা সচেতন ব্যক্তিরা অনুধাবন করতে পারেন..।

প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী বাড়ে, সেই সাথে বাড়তে থাকে তার পরিধি। মানুষের দৃষ্টি সজাগ হয়। কতিপয় ব্যক্তিত্ব উদার অন্তকরণে সামসুল হক খান উচ্চ বিদ্যালয় এর সুন্দর ভবিষ্যত রচনায় এগিয়ে এসেছেন। তাদের অবদান চির স্মরণীয় । শ্রদ্ধাভরে তাদের নাম উল্লেখ করছি - ১. জনাব তাজুল ইসলাম মিয়াজী ২.জনাব সামিউল আহসান ৩. মরহুম আনোয়ার হোসেন চেয়ারম্যান ৪.আলহাজ্ব হারুন -অর- রশীদ ৫. ডাক্তার আবুল হোসেন ৬. জনাব আলতাফ হোসেন মাস্টার ৭. ডাক্তার জসীম উদদীন সেলিম ৮. মরহুম হুমায়ন কবীর ৯.মরহুম শাহজাহান খান ১০. মরহুম আলহাজ্ব মতিউর রহমান প্রমুখ । এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত জীবিত ও মৃত সকলকে আল্লাহ সামগ্রিক কল্যাণ দান করুন।

প্রত্যাশা পূরণের জন্য দাপুটে পৌরুষ প্রয়োজন। এ বিদ্যাপীঠ সেটি পেয়েছিল। সেই দাপুটে কর্মবীরের হাতের স্পর্শে ঝিমিয়ে পড়া ডেমরার প্রাণ স্পন্দন জাগে। সে কথা ক্রমশ বলবো। ডেমরাবাসীর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দুশ্চিন্তা দূর হতেই তারা এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এই প্রশাসনের ছায়ায় ডেমরার মেয়েদের কলেজ শিক্ষার দাবি তোলে। একই প্রশাসনের অধীনে ২০০৩ সালে কলেজ শাখা খোলা হয়। কলেজ খুলে কেবল দাবি রক্ষা করা হয়নি। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কলেজটি পরিচালিত হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রথম বার ঢাকা বোর্ডে তৃতীয় হয়ে সেরাদশের মধ্যে সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজ অন্যতম সেরা হবার সৌভাগ্য অর্জন করে। অদ্যাবধি স্বর্ণোজ্বল সেরাদশে তার অবস্থান চলছে।

২০১৫ সলে সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজ ছাব্বিশ বছরে পদার্পন করলো। কত শ্রম, কত সাধনা, আর কত চড়াই উৎরাই এর মধ্যে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এলো। ছোট টিনশেডের কুটির হয়েছে ছয়তল বিশিষ্ট সুউচ্চ ভবন। ডজন শিক্ষক পরিণত হয়েছে দুইশত শিক্ষকে। শতেক শিক্ষার্থী বেড়ে হয়েছে দশ হাজার। আর্থিক দীনতায় এখন আর কেউ মলিন নয়। একটু হিসেব করেই দেখা যাক সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজের একাডেমিক অর্জন কতটুকু। মূলত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গৌরবাজ্জ্বল সাফল্য আসতে থাকে ২০০৪ থেকে। একটি সুশৃঙ্খল ও অনন্য চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত হবার পর প্রাইমারি সেকশনের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে ২০০৪ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রাপ্ত বৃত্তির সংখ্যা ৫৪০, একই সময়ের মধ্যে জুনিয়র মোট বৃত্তির সংখ্যা ৪০৬, ২০০৪-২০১৫ পর্যন্ত এসএসসি পর্যায়ে উত্তীর্ণদের সংখ্যা ৪৮৬৯, A+ ২৮২৬। ২০১৫ সালে ssc তে এ প্রতিষ্ঠান ঢাকা বোর্ডে ১ম হয়ে দেশসেরা হয়।  ২০০৫  থেকে ২০১৫ পর্যন্ত কলেজ শাখা প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় সহ সেরাদের মধ্যেই অবস্থান করে আসছে। ২০০৫-২০১৫ পর্যন্ত অবতীর্ণ  এইচএসসি পরীক্ষার্থী ২৬২৯, উত্তীর্ণ ২৬২৯, A+ প্রাপ্তি ১৫৬০। দেশের নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষিও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজগুলোতে সদম্ভে এখানের শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছে। গড়ছে তাদের হীরকোজ্জ্বল ভবিষ্যত।

এরপর পাখির মত শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে যে সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজ দিবভাগের সবটুকু সময় জুড়ে মুখরিত থাকে, যে ইউ টাইপের খয়েরি লাল ভবনটি মধ্যাহ্নের রোদ্রে ঝিলিকে চমকে দেয়, যার বালকোচিত শরীরটি দেড়-দুই যুগে হৃষ্টপুষ্ট পালোয়ান হয়ে উঠেছে তাকে নির্মানে লুই আই কানের কোন স্থপতি নিরলসভাবে দিনরাত কাজ করে গেছেন তার কথা না জানলো এই প্রতিষ্ঠানকে জানার ইচ্ছের প্রতি বড় অবিচার করা হবে। সেই স্থপতির উৎসর্গ ও অবদান না জানলে এই প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত অর্থে জানাও হয় না।

সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজের প্রিন্সিপাল ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা। শুধু ‌'প্রিন্সিপাল' পদের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তার সবটুকু পরিচয় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রদীপ ও প্রাণস্পন্দন। যার আগমন না ঘটলে এ প্রতিষ্ঠান আজ দেশের মধ্যে অন্যতম প্রোথিতযশা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারতোনা।  দেড়যুগের অধিককাল মাহবুবুর রহমান মোল্লা সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজের সাথে জড়িয়ে আছেন, একে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।

মাধ্যমিক শিক্ষাধারার অন্যতম পুরোধা ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ বাংলাদেশে ২ অক্টোবর, ১৯৭১ মাতুয়াইলের সম্ভ্রান্ত মোল্লা পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কৃতিত্বের সাথে মাতুয়াইলের বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে সমাপ্ত করেন। এইচএসসি উত্তীর্ণ হন প্রথম বিভাগে ঐতিহ্যবাহী নটরডেম কলেজ থেকে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন যথাক্রমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি নিজেকে সাংস্কৃতিক অংগনের সাথে জড়িয়ে রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি ডেমরা থেকে একটি অনিয়মিত সৃজনশীল সাময়িকী 'সংক্রম' নিজ সম্পাদনায় বের করতেন। লুপ্ত সেই 'সংক্রমের' কথা পাঠকেরা আজও মনে করে। 'জ্বালাও পোড়াও' স্বাধীনতা যুদ্ধে জন্ম নেয়া সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফ্রেস পোস্ট গ্রাজুয়েট মাহবুবুর রহমান মোল্লা ১৯৯৩ সালের প্রারম্ভে হেড মাস্টার হিসেবে সদ্য ভূমিষ্ট খুদে রুগ্ন দুর্বল সামসুল হক খান জুনিয়র হাইস্কুলের দায়ভার গ্রহণ করেছিলেন।  

তারপর এই দীর্ঘ সময়ে জীবনে যত সংগ্রাম, যত লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, যত গ্লানি এসেছে অকাতরে তিনি মাথা পেতে নিয়েছেন। পিছু হটেননি কিছুতেই। আজকের রাশি রাশি বৃত্তি ও A+, জাতীয় দৈনিকে শিরোনাম, স্মরণীয় সাফল্য, চমকে দেয়া সেরাদের সাড়িতে ডেমরার সামসুল হক, যুগান্তর প্রথম আলোর বিশেষ ফিচার, স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর ফোকাস, এসবই ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লার দেড়যুগের লৌহ কঠোর সাধনার ফল।

ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা সবসময় তার প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক ও অর্থবহ করার দিকে সচেতন। সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তিনি ঘুরে ঘুরে দেখেছেন এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার শ্রেষ্ঠ দিকগুলো তিনি এখানে মডেল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নবতর ধারা প্রবর্তনের তিনি অনন্য। কেবল তাই নয় মাধ্যমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ মান উপলদ্ধির জন্য সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের স্টেট ইউনিভার্সিটির অধীনে Secondary System in Bangladesh - অভিসন্দর্ভের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লালন ও যত্ন প্রযত্নের জন্য কেবল শ্রমই যথেষ্ট নয়, গভীর অভিজ্ঞতা ও তথ্য সঞ্চয় যে জরুরি এ কথা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এবং তা তার মত অনন্য শিক্ষাবিদের পক্ষেই বোঝা সম্ভব।

দেড়যুগ শ্রম ও সাধনার জন্য দীর্ঘ সময় কিন্তু সৃষ্টি ও প্রাপ্তির জন্য কয়েকটি বছর মাত্র। '৯০ - এর সাথে আজকের সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজের তুলনা করলে একে মিরাকেল বলেই মনে হবে। এই বেড়ে ওঠা ও বিস্তৃতি মিরাকেল নয়। একটি প্রতিষ্ঠানকে এতখানি এগিয়ে নিয়ে আসার ক্ষমতাটি মিরাকেল। এই 'মিরাকেল ক্ষমতা' বিপ্লবী ও সমাজ সংগঠকদের থাকতে হয় না হয় সমাজ বদলায় না। মাধ্যমিক শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্জন ও অগ্রগতির জন্য ২০০৮ সালে সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজ শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পদক প্রাপ্ত হয় ঢাকা শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক মনোনীত হয়ে। প্রিন্সিপাল ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমানের হাতে সে গ্রহণ করেন। বিগত বছরগুলোর গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যের ভিত্তিতে শিক্ষামন্ত্রণালয় ২০১২ সালে শিক্ষার মনোন্নয়নে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলগুলোকে ABCD  চারটি স্তরে রেংকিং করে যার মধ্যে সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজ রেংকিং এর ধারাবাহিকতায় চার নম্বরে অবস্থান করে। ২০১২ সালে ssc তে দ্বিতীয় সেরা হলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এ প্রতিষ্ঠানে আসেন এবং প্রতিষ্ঠানকে অভিনন্দিত করেন।

ইদানিং 'এডুস্মার্ট' নামে একটি ডিজিটাল কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। যার মাধ্যমে অভিভাবক দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার শিক্ষার্থী সন্তানের একাডেমিক রেকর্ড অবহিত হতে পারছেন। এর উদ্দেশ্য শিক্ষার মানোন্নয়ন। একটি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রাণশক্তি সহ-শিক্ষা কার্যক্রম। সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজ সে বিষয়ে পূর্ব থেকেই সচেতন। স্কাউট ও বিতর্ক  এর জোড় চর্চা চলছে।  এবং বিটিভিতে জাতীয় স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় এ প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় সেরা (Runners up) হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে।  এ ছাড়াও ইংরেজী ক্লাব, বাংলা প্রেম, বচন-কথন, সপ্তসুর ইত্যাদি অংগ সংগঠন তাদের নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে।

এইত সামসুল হক স্কুল এন্ড কলেজের জীবনপ্রবাহ। সে চলছে পৌরুষ দীপ্ত পুরুষের মত। গড়েছে সোনালি অতীত, আর ডাকছে, 'আয় চলে যায় হীরে ঝরা স্বপ্নের দেশে' ।